২৯ এপ্রিল ২০২৬ - ২২:৩২
হিজবুল্লাহ ধারণার চেয়ে ঢের শক্তিশালী

লেবানিজ সাংবাদিক কাসেম কাসির আলজাজিরাকে বলেন, অনেকে হিজবুল্লাহর পরাজয়ের কথা বললেও এটি স্পষ্ট যে তারা এখনও শক্তিশালী এবং সফলভাবে নিজেদের পুনর্বিন্যাস করতে সক্ষম হয়েছে।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তখন জনমনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইরানপন্থি এই লেবানিজ গোষ্ঠীটি সম্ভবত তাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

সেই সময় লেবাননে ইসরাইলের মারাত্মক আক্রমণে, দীর্ঘকাল ধরে হিজবুল্লাহর মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসা সৈয়্যদ হাসান নাসরুল্লাহসহ সংগঠনটির প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আগ্রাসন চালিয়েছিল, যে অঞ্চলটি লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। 

হিজবুল্লাহ এখনও শক্তিশালী : ২০২৪ সালের নভেম্বরের ‘যুদ্ধবিরতি’র পর ইসরাইল পরবর্তী ১৫ মাস ধরে লেবাননে তুলনামূলক কম মাত্রায় আক্রমণ চালিয়ে আসছিল, যদিও তাতে শত শত মানুষ নিহত হয়। হিজবুল্লাহ গত ২ মার্চ পর্যন্ত এর কোনো জবাব দেওয়া থেকে বিরত ছিল। কিন্তু মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার কয়েক দিন পরই তারা সক্রিয় হয়। খামেনি লেবাননের শিয়া গোষ্ঠীর কাছেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর পতন নিয়ে যে দাবি করা হয়েছিল তা ছিল অতিরঞ্জিত। হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ লেবানিজ সাংবাদিক কাসেম কাসির আলজাজিরাকে বলেন, অনেকে হিজবুল্লাহর পরাজয়ের কথা বললেও এটি স্পষ্ট যে তারা এখনও শক্তিশালী এবং সফলভাবে নিজেদের পুনর্বিন্যাস করতে সক্ষম হয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট ফেলো এবং হিজবুল্লাহকে নিয়ে একটি বইয়ের লেখক নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড আলজাজিরাকে জানান, হিজবুল্লাহর এই পুনরুত্থান মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। তাদের যথেষ্ট সক্ষমতা ও যোদ্ধা ছিল, তারা নিজেদের পুনর্গঠিত করার সময় পেয়েছে এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও ফুরিয়ে যায়নি।

আলোচনাই নির্ধারণ করবে হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ : যুদ্ধ চললেও বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় আলোচনা চলছে, যা লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথম ধারাটি হলো লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা। এপ্রিলের শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথম দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

লেবানন সরকার জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। লেবানিজ প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছেন, এটি ১৯৪৯ সালের দুই দেশের মধ্যকার অস্ত্রবিরতি চুক্তির মতো হতে পারে। 

তিনি সামাজিকমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, আমি কোনো অপমানজনক চুক্তি মেনে নেব না।

তবে হিজবুল্লাহ এই আলোচনার ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং উচ্চকণ্ঠে এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। সোমবার হিজবুল্লাহ নেতা শেখ নাঈম কাসেম এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা সরাসরি আলোচনা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের জানা উচিত, তাদের এই আলোচনার পদ্ধতি লেবানন বা তাদের নিজেদের কোনো উপকারে আসবে না।

আর্থিক সহায়তার জন্য হিজবুল্লাহ এখনও বড় আকারে ইরানের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধে ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হলেও তেহরান সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হিজবুল্লাহকে তাদের অস্তিত্ব ও স্বার্থের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে। ‘হিজবুল্লাহ : পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য পার্টি অব গড’-এর লেখক জোসেফ দাহের আলজাজিরাকে বলেন, হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা মানে ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা। ইরান তাদের ছেড়ে দেবে না।

সম্প্রতি খবর ছড়িয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করতে বলেছে। দাহেরের মতে, হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব থাকলেও হিজবুল্লাহকে কেবল একটি ‘প্রক্সি’ বা ভাড়াটে গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করা ভুল হবে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থ ভাগাভাগি করে এবং সমন্বয় বজায় রাখে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতি ইরানের যে অবিশ্বাস রয়েছে, তাতে তাদের লেবানিজ মিত্রকে পরিত্যাগ করার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অর্থনৈতিকভাবে সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন এই গোষ্ঠীর জন্য একটি বড় ক্ষতি ছিল, কারণ সিরিয়ার নতুন সরকার লেবাননে চোরাচালানের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পরিবর্তন হিজবুল্লাহর জন্য যথেষ্ট প্রতিকূল হলেও তা তাদের নিঃশেষ করতে পারেনি।

দাহেরের মতে, লেবানন রাষ্ট্রের মূল সমস্যা হলো তারা কেবল হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৈধতা দাবি করতে পারবে না। হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ জনসমর্থন কমাতে হলে, রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিজবুল্লাহর মূল অর্থায়ন সবসময়ই ইরান থেকে এসেছে। ইরান যদি টিকে থাকতে পারে, তবে হিজবুল্লাহও টিকে থাকার পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু সেই টিকে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে দেখতে কেমন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিভিন্ন পর্যায়ে চলা আলোচনার ফলাফলের ওপর।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha